'উন্নত জীবন’-এর মিথ ভেঙে রাজপথে ইউরোপের ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্ম

Total Views : 32
Zoom In Zoom Out Read Later Print

“ইউরোপ মানেই সোনার হরিণ আর নিশ্চিত উন্নত জীবন”—বিকাশমান বিশ্বের তরুণদের মনে গেঁথে থাকা এই চেনা ধারণাটি এখন খোদ ইউরোপের রাজপথেই কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জেরে অর্থনৈতিক চাপে টালমাটাল গোটা ইউরোপ। এর রেশ ধরেই ফ্রান্স থেকে শুরু করে আলবেনিয়া—একই সুতোয় গাঁথা ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে একাধিক দেশের রাজপথ। প্রতিটি দেশের তাৎক্ষণিক উপলক্ষ বা কারণ ভিন্ন মনে হলেও, এই গণবিক্ষোভের শেকড় বা মূল কারণটি প্রায় অভিন্ন: আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া, কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট এবং ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা।

গত কয়েক দিনে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়ায় যেভাবে তরুণ ও শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছেন, তাতে পরিষ্কার যে উন্নত বা উন্নয়নশীল—তফাত কেবল ভূগোলে, তরুণদের ধৈর্যের বাঁধ আজ সর্বত্রই ফুরিয়ে আসছে।

কোন দেশে কী হচ্ছে?

ফ্রান্স ও বেলজিয়াম: শিক্ষা খাতে বাজেট কাটছাঁট, শিক্ষক সংকট এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপে জর্জরিত শ্রেণিকক্ষ নিয়ে ফ্রান্সে শুরু হওয়া আন্দোলন রূপ নিয়েছে ভয়াবহ সংঘাতময় পরিস্থিতিতে। দেশটিতে ব্যাপক সংঘর্ষ ও সহিংসতার জেরে আন্দোলনকারীদের বড় একটি অংশ গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং বহু পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকারি ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার কড়া নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে ফরাসি তরুণদের এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রতিবেশী বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ইউরোর শিক্ষা বাজেট কাটছাঁটের পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করছেন।

স্পেন ও পর্তুগাল: এই দুই দেশের আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ভয়াবহ আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে শনিবার শত শত মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন এবং সহনীয় জীবনযাত্রার খরচের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন। অন্যদিকে, ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত মিছিল একপর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়; মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘাত ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

আলবেনিয়া: আলবেনিয়ায় তরুণদের এই ক্ষোভ আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমানের অভিযোগে গত কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল, যে প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট বলে উল্লেখ রয়েছে।

তরুণেরা আসলে কী চাইছেন?

ইউরোপের ভূগোলে দেশগুলো আলাদা হলেও তরুণদের স্লোগান ও দাবিগুলো আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যাচ্ছে। তাদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষার সুযোগ, নিশ্চিত কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন এবং সহনীয় জীবনযাত্রার ব্যয়। স্পেনের মতো দেশগুলোতে আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো আবাসন সংকট সমাধানে নতুন অধ্যাদেশ পাস ও বেশি করে বাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তবে সাধারণ তরুণদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ দায়

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতির একটি সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল সংঘাত এবং লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের চড়া দাম ইউরোপের সাধারণ মানুষের পকেট কেটে নিচ্ছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন—ইরান সংকট ও তেলের উচ্চমূল্যের কারণেই ইউরোপজুড়ে জনগণের অসন্তোষ ও প্রতিবাদ বাড়ছে।

তবে রাজপথের তরুণদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে ফরাসি ও ইউরোপীয় সরকারগুলো নিজেদের নীতিগত ব্যর্থতা এবং বাজেট কাটছাঁটের দায় এড়াতে চাইছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ তো আছেই, কিন্তু তার সঙ্গে শিক্ষা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক জায়গায় সরকারি কাটছাঁট তরুণদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে।

ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে নতুন প্রজন্মের

পূর্বে উন্নয়নশীল বিশ্বে—যেমন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশ্নফাঁস বা কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা থেকে তরুণ আন্দোলন দানা বাঁধতে দেখা গেছে। এবার খোদ ধনী ইউরোপের মাটিতেও ফুটে উঠল একই চিত্র।

এর আগে উন্নয়নশীল বিশ্বে—যেমন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশ্নফাঁস বা কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। আর এবার খোদ ধনী ইউরোপের মাটিতেও একই চিত্র ফুটে উঠল। উন্নত বিশ্ব হোক কিংবা উন্নয়নশীল রাষ্ট্র—শিক্ষা, চাকরি ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা না থাকলে যে একটি পুরো প্রজন্ম যেকোনো মুহূর্তে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়, ইউরোপের বর্তমান এই ধারাবাহিক বিক্ষোভ তারই এক নির্মম ও স্পষ্ট বার্তা।

See More

Latest Photos