হামের টিকা দেওয়ার পরও অনেক শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি নেই, বলছে গবেষণা

Total Views : 34
Zoom In Zoom Out Read Later Print

জাতীয় হাম–রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের পর করা একটি গবেষণায় ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে হামের অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫ জনের শরীরে অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়নি। তবে গবেষণাটি সীমিতসংখ্যক শিশুর ওপর হওয়ায় এ ফলাফল দিয়ে দেশের সব শিশুর মধ্যে টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

গবেষণাটি করেছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তা। গবেষণায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক ও ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের গবেষকেরা যুক্ত ছিলেন।

গবেষণার সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জের ছয়টি উপশহর ও গ্রামাঞ্চল থেকে ৯ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩০৯ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শিশুদের টিকা নেওয়ার তথ্য টিকাকার্ড ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে যাচাই করা হয়। পরে তাদের রক্তের নমুনা আইইডিসিআরের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, ৩০৯ শিশুর মধ্যে ২০৩ জনের, অর্থাৎ ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়েছে। আরও ২১ শিশুর, অর্থাৎ ৬ দশমিক ৮ শতাংশের অ্যান্টিবডির মাত্রা ছিল সীমান্তবর্তী পর্যায়ে। বাকি ৮৫ শিশুর, অর্থাৎ ২৭ দশমিক ৫ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়নি।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠার হার কম। গবেষকদের মতে, টিকার ডোজের সংখ্যাও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ২০ এপ্রিল দেশজুড়ে হাম–রুবেলার বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে। তবে এরপরও দেশে হামের সংক্রমণ অব্যাহত থাকে।

এই পরিস্থিতিতে টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে কতটা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নতুন গবেষণাটি সেই প্রশ্নের একটি প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরেছে। তবে অ্যান্টিবডি শনাক্ত না হওয়া এবং টিকা সামগ্রিকভাবে কার্যকর না হওয়া—দুটি বিষয় এক নয়। টিকার ডোজ, শিশুর বয়স, পুষ্টিগত অবস্থা, নমুনা নির্বাচন ও পরীক্ষার ফলসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারির মতে, টিকার কার্যকারিতা বিভিন্ন কারণে কমে যেতে পারে। টিকা উৎপাদনের পর সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রতিটি পর্যায়ে নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখা জরুরি। কোনো পর্যায়ে তাপমাত্রার ব্যত্যয় ঘটলে টিকার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অপুষ্টিও শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, টিকা কেন প্রত্যাশিত মাত্রায় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করতে পারছে না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি।

টিকাদানব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ

গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের বিভিন্ন কারণ তুলে ধরে। তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকাদান থেকে বাদ পড়ে।

ওই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন টিকার মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ও শিশুর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় টিকার কার্যকারিতা অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি।

অন্যদিকে, আইইডিসিআরের গবেষণার নমুনা সীমিত বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, এই ফলাফল থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম এ সাফি জানিয়েছেন, তিন হাজার শিশুকে নিয়ে আরেকটি গবেষণা চলছে। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০ শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ওই গবেষণার ফল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদনে উল্লেখিত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। ওই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরে হামের উপসর্গ নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছেন ১০৪ জন।

সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ টিকাদানের আওতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, টিকাদানের আওতা ৯৫ শতাংশের বেশি করা, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী টিকার আওতায় আনা এবং নিয়মিত বিরতিতে জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা দরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, টিকার সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা যাচাই করা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর গবেষণা চালানো গুরুত্বপূর্ণ। নতুন গবেষণার ফলাফল এসব ক্ষেত্রে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

See More

Latest Photos