সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে একটি পডকাস্টে কথা বলেছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরি। বুধবার (২৮ অক্টোবর) তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। তবে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন, ভিডিও ফাঁসের অভিযোগে কী বলেছিলেন তিনি?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিমানবাহিনীর দুই কর্মকর্তার নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল। তাঁদের একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী। তিনি বিমানবাহিনীর কুর্মিটোলা এয়ারবেইসের অফিসার্স মেসের একটি কক্ষের জানালা থেকে ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়। অন্যদিকে, তাহসিফ সৌরি ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
তবে ভিডিওটি কে ধারণ করেছিলেন এবং কীভাবে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য ও অভিযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মূল ভিডিও ধারণের বিষয়টি তাহসিফ নিজেও পডকাস্টে অস্বীকার বা নিশ্চিত করেননি; বরং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণের প্রশ্ন তুলেছিলেন।
পডকাস্টে কী বলেছিলেন তাহসিফ?
‘স্পিক উইথ রশিদ’ ইউটিউব চ্যানেলে গত ২১ জুলাই ‘Milestone Tragedy: Inside the Bangladesh Air Force’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি পডকাস্টে অংশ নেন তাহসিফ। সেখানে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনার একপর্যায়ে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়।
জবাবে তাহসিফ বলেন, একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। তবে ভিডিওটি ধারণ করার দায়িত্ব রিফাত আশরাফীর বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাহসিফ প্রশ্ন তোলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে।
পডকাস্টে তিনি আরও বলেন, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের কারণে তাঁকে বিমানবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ওই সময়ের কিছু ঘটনা নিয়ে সব কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তাহসিফের এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ এবং বিমানবাহিনী থেকে তাঁর অব্যাহতির মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে তাঁর বক্তব্য নিজেই এ সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
সহপাঠীর পোস্টে নতুন করে আলোচনা
তাহসিফের মৃত্যুর পর তাঁর সহপাঠী ও সহকর্মী কেএসএম ইনতিসার ইনজিমাম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি তাহসিফকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ভাইরাল করার সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন।
ইনতিসার লেখেন, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর তাহসিফের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে মানহানি করা হয়েছিল বলে তাঁর ধারণা। তাঁর দাবি, তাহসিফের বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা হয়েছিল বলে তিনি জানেন না। পোস্টে তিনি তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তবে এগুলো ইনতিসারের ব্যক্তিগত বক্তব্য ও ধারণা। তাঁর পোস্টে উত্থাপিত সন্দেহের পক্ষে কোনো তদন্তের ফলাফল বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণের উল্লেখ নেই। ফলে এসব বক্তব্যের ভিত্তিতে তাহসিফের মৃত্যুকে ভিডিও ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার সুযোগ নেই।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার মরদেহ
মঙ্গলবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দিন জানান, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকায় নদীতে ভাসমান অবস্থায় মরদেহটি পাওয়া যায়। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে নৌ পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মরদেহটি কচুরিপানার মধ্যে ভাসমান অবস্থায় ছিল। উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে সাদা ট্রাউজার ও কালো জামা ছিল। পরে পরিচয় শনাক্ত করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
ঢাকা জেলা নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, মরদেহের বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন।
নৌ পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে, উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় তখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি।
তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর কারণ এবং শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—দুটি বিষয়ই আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য জানা যেতে পারে।