দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চার দিনের সফল জাপান সফর শেষে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
আজ শুক্রবার রাত ২টা ৪৮ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, এর আগে বৃহস্পতিবার জাপানের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত জাপান সফর করেন তারেক রহমান। সফরকালে তিনি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেন, জাপানের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন করেন।
গত ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে দুই নেতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিনিয়োগ পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে একটি জাপানি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও সম্মত হন দুই নেতা।
এই ঐতিহাসিক সফরের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে ৬টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি, ৪৬.৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের দুটি ‘ইয়েন-লোন’ (ঋণ সহায়তা) প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদার করতে টহল জাহাজ সংগ্রহের লক্ষ্যে ২.১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১৩.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অনুদান সহায়তা চুক্তিও রয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন, কৃষি, দক্ষতা উন্নয়ন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যৌথ সহযোগিতার বিষয়ে চুক্তি ও আগ্রহপত্র স্বাক্ষরিত হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, সরকারি পর্যায়ের চুক্তির পাশাপাশি টোকিওতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)-তে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২৮ অক্টোবর জেট্রো সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগ’-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের অটোমোবাইল, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ, উচ্চগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
সফরকালে তিনি জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকা, জেবিআইসির গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে বৈঠক করেন। পাশাপাশি ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোং, সুমিতোমো কর্পোরেশন এবং জেরার মতো বিশ্বখ্যাত জাপানি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা করেন।
সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ফুত্তসুতে অবস্থিত ‘জেরা’-এর এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ইচিকাওয়ার ‘নিতসু’ লজিস্টিকস হাব এবং নাগোয়াতে টয়োটা মোটর কর্পোরেশনের মোতোমাচি কারখানা ও ইন্ডাস্ট্রি মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন।
বাংলাদেশ ও জাপানের প্রথম ‘ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট’ (ইপিএ) এর প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও নতুন উচ্চতায় উন্নীত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।