সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহতদের মধ্যে সৌদি নাগরিকদের পাশাপাশি বাংলাদেশের দুই নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। হামলার পর বিমানবন্দরটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
হোয়াইট হাউসের দক্ষিণ লনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযানে যুক্ত হতে পারে। বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি জানান, হামলার খবর পাওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলা
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত কয়েক দিনে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। শনিবারের হামলায় বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য ব্যবহৃত ৩ ও ৪ নম্বর টার্মিনালসংলগ্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরটিতে হামলার দায় স্বীকার করেছিল হুতিরা। ওই ঘটনায় সৌদি আরবের তিন নাগরিক নিহত হন, যাঁদের মধ্যে একজন পাইলট ছিলেন। তবে শনিবারের সর্বশেষ হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করেনি গোষ্ঠীটি। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অবশ্য হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে এবং পাল্টা জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
সপ্তাহজুড়ে হামলার কারণে রিয়াদের বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ফ্লাইট চলাচলের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের হিসাবে, শনিবার বিমানবন্দরটিতে কয়েক শ ফ্লাইট বাতিল হয়। যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে নিজ নিজ বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল। রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি
ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করার পর সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনা বেড়েছে। গত ৪ অক্টোবর হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয় ইয়েমেনের সরকার। এর পর থেকে বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি বলেছেন, এসব হামলার জবাব দেওয়া হবে এবং হামলাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। তবে পাল্টা পদক্ষেপের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এর আগে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের সৌদি আরবের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার সতর্কবার্তা দেন। সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোকেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করে সেখান থেকে কর্মীদের দূরে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বাব আল-মানদেব প্রণালি ঘিরে উদ্বেগ
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির আরেকটি কারণ লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইয়েমেনের সংঘাত এ অঞ্চলের নৌ চলাচলে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাব আল-মানদেব প্রণালিতেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় আরও চাপে পড়তে পারে।
ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত বাহিনী কৌশলগত কিছু এলাকা পুনর্দখলের দাবি করেছে। তবে কয়েকটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পক্ষগুলোর বক্তব্যে অমিল রয়েছে। এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে জনমতের প্রভাব
সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক অভিযানে সরাসরি যুক্ত হওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
১ অক্টোবর পরিচালিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-নরক জরিপে ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের মিত্র। তবে ইয়েমেনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা করা হয়নি। রিয়াদের বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলার পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।