সুনামগঞ্জ-কাছিরগাতি-বিশ্বম্ভরপুর সড়ক নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তোলার পর সুনামগঞ্জ-৪ (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুলের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়েছে জেলা বিএনপি। এ ঘটনাকে মিথ্যা প্রচারণা ও তথ্য সন্ত্রাস আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে সড়ক প্রকল্পের অনিয়ম তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছে তারা।
সোমবার সকাল ১১টায় সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন বাসস্টেশন এলাকার পানসী রেস্টুরেন্টের হলরুমে জেলা বিএনপির উদ্যোগে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। এ সময় সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল হকসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন বলেন, সুনামগঞ্জ-কাছিরগাতি-বিশ্বম্ভরপুর সড়ক প্রকল্পের কাজ পেয়েছিল ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির মালিক বদরুল ইসলাম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদার দেশ ছেড়ে চলে গেলে প্রথমে তাহিরপুরের বালিজুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী আজাদ হোসেনকে সাব-ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে তাঁর সঙ্গে মতবিরোধের কারণে শফিকুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তিকে দ্বিতীয় সাব-ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, গত ২৭ অক্টোবর বিশ্বম্ভরপুরের রতারগাঁও হাইস্কুলে একটি অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে স্থানীয় বাসিন্দারা সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুলকে সড়কের নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ জানান। পরে সংসদ সদস্য নিজেও সড়কের একটি সদ্য নির্মিত গার্ডওয়াল হেলে পড়া, ব্লক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং মাটি কম্প্যাকশন না করে জিওটেক্সটাইলের ওপর নিম্নমানের ব্লক বসানোর বিষয়টি দেখতে পান বলে লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া ভিট বালুর পরিবর্তে কৃষিজমির ওপরের মাটি ব্যবহারের অভিযোগও তোলা হয়। এসব বিষয় পরিদর্শনের জন্য পরদিন ঠিকাদারকে উপস্থিত রাখতে তাঁর প্রতিনিধিকে অনুরোধ করেন সংসদ সদস্য। এ সময় সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে কাজের স্থান পরিদর্শনের কথা জানান তিনি।
কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের অভিযোগ, এসব অনিয়মের বিষয় সামনে আসার পর সাব-ঠিকাদার সংসদ সদস্য নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ করে লিখিত আবেদন করেন। জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে এ অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বলে দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ৪০ কোটি টাকা হলেও তা ৮৭ কোটি টাকা দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে সাত লাখ ঘনফুট মাটির প্রয়োজনের বিপরীতে ৫৬ লাখ ঘনফুট মাটির হিসাব দেখানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং ইতিমধ্যে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হয়েছে। উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা ভাগাভাগি করেছেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়। প্রকল্পের ব্যয়সংক্রান্ত তথ্যসম্বলিত কোনো সাইনবোর্ড জনগণের সামনে প্রদর্শন করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
এসব অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরে জেলা বিএনপি।
দাবিগুলো হলো—
১. প্রকল্পের শুরুতে দুর্নীতির পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
২. প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে যে অর্থ বরাদ্দ বা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারের কাছ থেকে সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. ইতিমধ্যে নিম্নমানের যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলো বাতিল করে নকশা অনুযায়ী মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে পুনরায় কাজ করতে হবে।
৪. সড়ক সংস্কারকাজে দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সড়ক বিভাগের প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চলমান সব প্রকল্পের কাজ ও সম্ভাব্য দুর্নীতি-অনিয়ম তদন্ত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপি নেতারা বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কের নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।