জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও তরুণদের রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। তাঁরা বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও অর্জনকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্যথায় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) আয়োজনে ‘বছর পেরিয়ে জুলাই সনদ: গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদীউজ্জামান খোকন সভা সঞ্চালনা করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম এবং দৈনিক ওয়াদা’র সম্পাদক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। স্বাগত বক্তব্য দেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।
সভাপতির বক্তব্যে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বর্তমান সংবিধান এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র মেরামতের জন্য নতুন করে একটি সনদ তৈরির প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, সেই সনদে চার কোটি মানুষের স্বাক্ষর নেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জনগণকেই প্রকৃত অংশীজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতার কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে উপহাস করে ‘এনজিওগ্রাম সরকার’ বলা হতো। তাঁর দাবি, অব্যবস্থাপনা ও অযোগ্যতার কারণে বর্তমান সরকারকেও অনেকে ‘লন্ডনী-গো’ সরকার বলছে।
মঞ্জু আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ রুখতে গণ-অভ্যুত্থানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার কথা ড. মাহমুদুর রহমান আগেই বলেছিলেন। তাঁর মতে, গণ-অভ্যুত্থান কিংবা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়নি; বরং সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, জেন-জি সফলভাবে ফ্যাসিবাদের প্রতীককে পরাজিত করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র মেরামতের যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তরুণেরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, তা এখনো পূরণ হয়নি।
জুলাই সনদ প্রণয়নের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সনদ তৈরির প্রক্রিয়ায় ভুল ছিল। রাজনৈতিক পরিপক্বতা থাকলে জুলাই সনদের আগে নির্বাচন দেওয়া হতো না। ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে সই করার প্রক্রিয়াটিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের অগ্রাধিকারের জায়গায় সমস্যা ছিল। তরুণেরা রাষ্ট্র সংস্কার চাইলেও সেই আকাঙ্ক্ষা যথাযথভাবে অনুধাবন করা হয়নি। তবে অনভিজ্ঞতার কারণে সরকার নানা চাপের মুখে পড়েছিল। জুলাইয়ের অনেক তরুণ সংগঠন সরকারকে সহযোগিতা না করে অসহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, বিএনপিও সরকারকে সহযোগিতা করেনি; সব মিলিয়ে সেটি ছিল একটি দুর্বল সরকার।
নির্বাচনের পর জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এখন কে দেশের ভেতর থেকে এবং কে দেশের বাইরে থেকে আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন, তা নিয়ে কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। অথচ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। বিভাজনমূলক বক্তব্যের দায় সরকারকে নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে এবি পার্টিসহ বাংলাদেশপন্থী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান মাহমুদুর রহমান। এ লক্ষ্যে জাতীয় কনভেনশন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, বিভাজন অব্যাহত থাকলে দেশের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। জুলাই বিপ্লবকে এক দিনের ঘটনা নয়, বরং চলমান প্রক্রিয়া হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশেষ অতিথি অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের বলা হচ্ছে, তাঁরা আন্দোলন করেছেন, এখন রাষ্ট্র নিয়ে আর ভাবার প্রয়োজন নেই; পড়ার টেবিলে ফিরে যেতে হবে। কোনো কোনো রাজনীতিবিদ আন্দোলনকারীদের অবদানকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তাজুল ইসলাম বলেন, ১৭ বছর ধরে যে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হয়নি, তরুণেরা তা আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন করেছেন। জুলাই সনদের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রচলিত আইন ও সংবিধানের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে জনগণের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়েছে। তাঁর মতে, আইন ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই সনদ অমান্য করা যাবে না।
দৈনিক ওয়াদা’র সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, জুলাইকে শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও এর চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের মতো পরিস্থিতি যেন আবার তৈরি না হয়, সে জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ কীভাবে তৈরি হয় এবং এর পেছনে কারা ভূমিকা রাখে, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করার আহ্বান জানান তিনি।
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন তারুণ্যের জুলাই ফাউন্ডেশনের নেতা সাগর উদ্দিন, পুসাবের সংগঠক তালহা বিন আমীন, জুলাই ঐক্যের নেতা রিয়াদুস ইসলাম জুবা, জুলাই যোদ্ধা লাবিব, স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সংগঠক সাইয়েদ আহমেদ সরকার, শহীদ সোহেল রানার ভাই আলভী নাবিল, জুলাই রেভ্যুলেশন ওয়াচের সংগঠক সানজিদ হাসান তানভীর, বৈষম্যবিরোধী কওমির সদস্যসচিব মাসুদুর রহমান জুনায়েদ, প্রতিবন্ধী নাগরিক পরিষদের সংগঠক ইফতেখার মাহমুদ, জুলাই সংগঠক নেছার উদ্দিন, শহীদ রাকিবের ভাই আমিন উদ্দিন, মঞ্চ ২৪-এর সংগঠক ইশরাত করিম অর্পিতা, দ্য রেড জুলাইয়ের সংগঠক রাসেল মাহমুদ এবং মুস্তাইন বিল্লাহ হাবীবি।
এবি পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া ও শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক গোলাম রব্বানী রাজা, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন এবং খুলনা সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়ামিনুর রহমানসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।