পাকিস্তানের সঙ্গে বড় চুক্তি চীনের , স্বাগত জানালেন শেহবাজ

Total Views : 12
Zoom In Zoom Out Read Later Print

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শুক্রবার (১৭ জুলাই) পাকিস্তানি ও চীনা ওষুধ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪৪০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের ৯টি চুক্তি স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন, পাকিস্তানে কর্মরত চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ‘কোনো ধরনের প্রচেষ্টারই কমতি রাখবে না।’ ইসলামাবাদে পাকিস্তান-চীন বিজনেস-টু-বিজনেস (বি-টু-বি) ফার্মাসিউটিক্যাল, স্বাস্থ্যসেবা ও বায়োটেকনোলজি সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে শাহবাজ প্রায় ৩০০ জন চীনা প্রতিনিধির নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, পাকিস্তানে অবস্থানরত আমাদের চীনা ভাই-বোনদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কোনো প্রচেষ্টাই বাদ দেব না।” প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দেশের ওষুধশিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই চুক্তিগুলো শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাস্তবায়নের মাধ্যমে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-এর দ্বিতীয় ধাপের অগ্রযাত্রাকে আরও এগিয়ে নেবে।

তিনি বলেন, “আমরা আজ প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পাকিস্তানি ও চীনা উদ্যোক্তাদের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের সাক্ষী হয়েছি।”

 প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সম্মেলনে পাকিস্তানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত, দুই দেশের ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি, ফেডারেল মন্ত্রী, বিশেষ সহকারী, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং অন্যান্য অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনে পাকিস্তান ও চীনের বেসরকারি ওষুধ খাতের মধ্যে স্থানীয়ভাবে টিকা উৎপাদন, বায়োটেকনোলজি, ওষুধ উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং হেপাটাইটিস প্রতিরোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া জাতীয় সুরক্ষামূলক টিকাদান কর্মসূচিতে সহযোগিতার বিষয়েও একটি পৃথক সমঝোতা চূড়ান্ত করা হয়।

শাহবাজ শরিফ চীনকে পাকিস্তানের “সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু” উল্লেখ করে বলেন, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “চীন সব আন্তর্জাতিক ফোরামে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে এবং সিপিইসি ১.০-এর আওতায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে।” এ জন্য তিনি চীনা নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানান।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে “দূরদর্শী নেতা” আখ্যা দিয়ে শাহবাজ বলেন, তিনি চীনের সমাজ ও অর্থনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছেন। তিনি শিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের অভূতপূর্ব অগ্রগতিরও প্রশংসা করেন।

দুই দেশের ব্যবসায়ী, পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, শিল্প ও উৎপাদনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, পাকিস্তানে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত এবং চীনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতারও প্রশংসা করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিয়েও মন্তব্য

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত বিশ্বে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন শাহবাজ শরিফ।

তিনি বলেন, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং চীনসহ বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো এতে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছে। তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও এ প্রচেষ্টায় পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।

পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “দুই দেশের বন্ধুত্ব হিমালয়ের চেয়েও উঁচু, মধুর চেয়েও মিষ্টি এবং ইস্পাতের চেয়েও শক্তিশালী।”

 

চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়ায় চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। বিশেষ করে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার এবং ২০২২ সালে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেওয়ার পর খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে কর্মরত চীনা প্রকৌশলী ও নাগরিকরাও হামলার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-এর বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে কর্মরত চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে একাধিক হামলা হয়েছে।

বুধবার পাকিস্তান সরকার জানায়, বেলুচিস্তানের সাইন্দাক তামা ও স্বর্ণখনিকে ঘিরে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হচ্ছে। কারণ সন্ত্রাসী হামলার কারণে সেখানে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী জানান, খনি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জুলাইয়ের শুরুতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এরপর সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, কর্মী, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর পরিচালিত সব প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের অগ্রাধিকার।”

বেলুচিস্তানে চীনের অর্থায়নে গভাদর গভীর সমুদ্রবন্দরসহ একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এছাড়া সাইন্দাক খনিটি চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত মেটালার্জিক্যাল করপোরেশন অব চায়না (এমসিসি) পরিচালনা করছে এবং উৎপাদিত অধিকাংশ খনিজ চীনে রপ্তানি করা হয়।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে এবং দেশটিতে চীনা নাগরিক, প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের জুলাইয়ে দাসু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত চীনা নাগরিকদের বহনকারী একটি বাসে আত্মঘাতী হামলায় ১০ জন চীনা নিহত ও ২৬ জন আহত হন।

এরপর ২০২৪ সালের মার্চে খাইবার পাখতুনখাওয়ার বেসহামে আত্মঘাতী হামলায় পাঁচ চীনা প্রকৌশলীসহ ছয়জন নিহত হন। একই সময় করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে বিস্ফোরণে দুই চীনা প্রকৌশলীসহ তিনজন নিহত এবং অন্তত ১১ জন আহত হন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান সরকার চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ স্পেশাল প্রোটেকশন ইউনিট (এসপিইউ) গঠন করে এবং তাদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করে।


See More

Latest Photos