লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে একটি মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের পায়ে শিকল বেঁধে রাখা এবং মারধরের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দৃশ্যে শিশুদের শারীরিক নির্যাতনের চিত্র দেখা যাওয়ায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
লক্ষ্মীপুরের মাদ্রাসায় শিশুদের পায়ে শিকল, নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল
ছড়িয়ে পড়া ছবিতে ছয় থেকে সাত বছর বয়সী দুই শিশুর পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। একটি ছবিতে শিশুকে কান্নারত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অন্য ছবিতে পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় এক শিশুকে কোরআন পড়তে দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছবিগুলো লক্ষ্মীপুরের রামগতি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আলেকজান্ডার মাদ্রাসায়ে বাবুত তাকওয়া থেকে তোলা। গত বছর একটি ভবনের দ্বিতীয় তলা ভাড়া নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হয়। বর্তমানে সেখানে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে মারধরের দৃশ্য
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে শিশুদের মারধরের দৃশ্য দেখা যায়। একটি ভিডিওতে কক্ষের দরজা বন্ধ করে এক শিক্ষককে এক শিশুকে বারবার চড়-থাপ্পড় দিতে দেখা গেছে। একপর্যায়ে শিশুটির মাথায় আঘাত করা হয়। পরে স্টিলের স্কেল দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করার দৃশ্যও রয়েছে।
অন্য একটি ভিডিওতে এক শিশুকে দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে মাথায় উপর্যুপরি চড়-থাপ্পড় দিতে দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে মারধরের দৃশ্য দেখা গেছে। ভিডিওগুলো প্রতিষ্ঠানটির সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, মাদ্রাসাটিতে শিশুদের সঙ্গে প্রায়ই অমানবিক আচরণ করা হতো। তবে শিশুরা বাড়িতে গিয়ে এসব ঘটনা অভিভাবকদের জানাত না। ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, ভিডিওগুলো প্রায় এক মাস আগের।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
ভিডিওতে দুই শিক্ষককে শিশুদের মারধর করতে দেখা গেছে। তাঁদের একজন হাবিব উল্লাহ, যিনি মাদ্রাসাটির প্রধান শিক্ষক। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রামগতি পৌরসভা শাখার সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। অন্য শিক্ষকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শিশুদের নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করে হাবিব উল্লাহ জানিয়েছেন, ঘটনাটি ভুল হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন সতর্ক করেছে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে অভিভাবকেরা সতর্ক করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন। নির্যাতনের ভিডিওতে দেখা যাওয়া শিক্ষার্থীরা বর্তমানে মাদ্রাসায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
মামলা না হলে কী হবে?
রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক হাবিব উল্লাহ নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁদের মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিভাবকেরা কেউ মামলা করতে রাজি হননি বলে জানান তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) লক্ষ্মীপুর শাখার সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষালাভের কথা। সেখানে তাদের পায়ে শিকল বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা অমানবিক ও নিন্দনীয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।