মেন্টাল ডিপ্রেশনে ভুগছেন অনেকেই চারিদিকে যুদ্ধ বিগ্রহ, —কিভাবে পরিত্রাণ মিলবে?

Total Views : 13
Zoom In Zoom Out Read Later Print

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—টেলিভিশন খুললেই উদ্বেগের খবর। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত, গাজা স্ট্রিপে যুদ্ধপরিস্থিতি কিংবা ইরান ও ইসরাইলের উত্তেজনা—এসব সংবাদ প্রতিদিন আমাদের মানসিকতায় চাপ তৈরি করছে। আমরা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না থাকলেও, মানসিকভাবে যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধের মধ্যেই বাস করছি। অস্থিরতা, অনিদ্রা, মন খারাপ, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়—এসবই ধীরে ধীরে ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এই সময়ে প্রশ্ন একটাই—কীভাবে নিজেকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রাখব?

যুদ্ধ-সংবাদ ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা কী বলছে? মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন জানায়, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতপূর্ণ সংবাদে নিয়মিত এক্সপোজার মানুষের উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। এছাড়া আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, টানা নেতিবাচক সংবাদ দেখলে ‘ভিকারিয়াস ট্রমা’ বা পরোক্ষ ট্রমা তৈরি হতে পারে—অর্থাৎ আপনি ঘটনাস্থলে না থেকেও মানসিক আঘাত অনুভব করতে পারেন। গবেষণা আরও বলছে, দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি যুদ্ধসংবাদ দেখলে উদ্বেগের মাত্রা দ্বিগুণ হতে পারে, অনিদ্রা ও প্যানিক অ্যাটাকের প্রবণতা বেড়ে যায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে।

কেন আমরা এতটা প্রভাবিত হই? প্রথমত, নিরাপত্তার বোধ নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে নিরাপত্তা খোঁজে এবং যুদ্ধের খবর সেই নিরাপত্তাবোধকে নাড়া দেয়। দ্বিতীয়ত, অতিসংবেদনশীলতা ও সহানুভূতি। বিশেষ করে যারা সংবেদনশীল, তারা অন্যের কষ্ট নিজের মতো অনুভব করেন। তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার। অ্যালগরিদম আমাদের বারবার একই ধরনের উদ্বেগজনক কনটেন্ট দেখায়, ফলে মানসিক চাপ বাড়তেই থাকে।

তাহলে কীভাবে মিলবে পরিত্রাণ? প্রথমে সংবাদ গ্রহণে সীমা নির্ধারণ করুন। দিনে নির্দিষ্ট সময়ে খবর দেখুন এবং সারাদিন ‘লাইভ আপডেট’ দেখা বন্ধ করুন। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ডিটক্স। সপ্তাহে অন্তত একদিন সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া সময় কাটান এবং প্রকৃতির সাথে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর। তৃতীয়ত, নামাজ, মেডিটেশন ও শ্বাস-প্রশ্বাস অনুশীলন। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম (৪-৭-৮ পদ্ধতি) উদ্বেগ কমাতে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এবং আধ্যাত্মিক চর্চা মনকে স্থির করে। চতুর্থত, রুটিন ও শরীরচর্চা। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করলে এন্ডোরফিন নিঃসরণ হয়, যা প্রাকৃতিক ‘মুড লিফটার’। পঞ্চমত, কথা বলুন, চেপে রাখবেন না। বন্ধু, পরিবার বা প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, সাহস।

 

ছোট ছোট সুখে বাঁচার চর্চা করুন। যেমন, পরিবারের সাথে একসাথে খাওয়া, প্রিয় বই পড়া, বাগান করা বা শিশুর হাসি শুনে সময় কাটানো। বিশ্বে যুদ্ধ থাকলেও, আপনার ঘরে শান্তি তৈরি করা সম্ভব। কখন পেশাদার সাহায্য নেবেন? দুই সপ্তাহের বেশি মন খারাপ থাকলে, ঘুম বা ক্ষুধার বড় পরিবর্তন হলে বা আত্মহানির চিন্তা এলে অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

 

যুদ্ধ থামানো হয়তো আমাদের হাতে নেই, কিন্তু নিজের মনকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। বিশ্ব অস্থির হতে পারে, কিন্তু নিজের ভিতরে একটি শান্ত আশ্রয় তৈরি করা সম্ভব। আপনি একা নন। এই সময় কেটে যাবে—কিন্তু আপনার মানসিক সুস্থতা যেন অটুট থাকে, সেটাই সবচেয়ে বড় জয়।

See More

Latest Photos