ইরান ইস্যুতে আরব দেশগুলো যুদ্ধে জড়াচ্ছে,মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ : —দাবি ট্রাম্পের

Total Views : 7
Zoom In Zoom Out Read Later Print

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভয়াবহ সংঘাতে নতুন মোড় এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি অভিযানে প্রথমে যোগ দিতে অনিচ্ছুক আরবের কয়েকটি দেশ এখন সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। ইরানের ব্যাপক পাল্টা হামলার মুখে তাদের এই অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি । ২ মার্চ) সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, "আমরা অবাক হয়েছি। আমরা তাদের বলেছিলাম, 'আমরা সামলাতে পারব', কিন্তু এখন তারা লড়াই করতে চায়। আর তারা আক্রমণাত্মকভাবে লড়াই করছে। তাদের খুব কম জড়িত থাকার কথা ছিল, কিন্তু এখন তারা পুরোপুরি জড়িত থাকার ওপর জোর দিচ্ছে" । ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময় এলো যখন গত কয়েক দিনে ইরান বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে । এই হামলায় বেশ কয়েকটি দেশের বেসামরিক স্থাপনা, হোটেল ও আবাসিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুবাইয়ের বিশ্ববিখ্যাত বুর্জ আল আরব হোটেলের গায়েও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানে, যা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে । ট্রাম্প ইরানের এই কৌশলকে 'এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চমক' বলে অভিহিত করে বলেন, "তারা (ইরান) একটি হোটেলে গোলা ছুড়েছে, একটি অ্যাপার্টমেন্ট বাড়িতে ছুড়েছে। এতে আরব দেশগুলো ক্ষিপ্ত হয়েছে। তারা আমাদের ভালোবাসে, কিন্তু তারা দেখছিল। তাদের জড়িত হওয়ার কোনো কারণ ছিল না, এখন তারা জড়িত হতে বাধ্য হচ্ছে" ।

ট্রাম্পের এই দাবির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ছয়টি আরব দেশ একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিবৃতিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাকে 'বেপরোয়া এবং অযৌক্তিক' বলে নিন্দা জানানো হয় ।

বিবৃতিতে দেশগুলো ইরানের এই আচরণকে 'একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি, যা একাধিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ' হিসেবে বর্ণনা করে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "এই অন্যায্য হামলাগুলো সার্বভৌম অঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে বিপন্ন করেছে এবং বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমরা আমাদের নাগরিক, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ" ।


বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিবৃতি এবং ট্রাম্পের দাবি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অবস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন ও সংঘাত এড়ানোর নীতি অনুসরণ করছিল ।

সৌদি আরব তার বিশাল অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা 'ভিশন ২০৩০'-এর জন্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চাইছিল, আর আমিরাত নিজেকে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল ।

কিন্তু ইরানের সরাসরি ও ব্যাপক হামলার মুখে এই নীতিতে পরিবর্তন আসছে। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ এলহাম ফাখরো বলেন, "এই হামলাগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী ঐক্যের সৃষ্টি করেছে। তবে এটি রাজনৈতিক নয়, বরং অপারেশনাল ঐক্য। তাদের আকাশসীমা, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীলতা একই রকম। এই মৌলিক ভাগ করা ঝুঁকিই তাদের একত্রিত করেছে" ।


এই সংকটে সৌদি আরবের অবস্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও গোপনে তিনি তেহরানে হামলা চালানোর জন্য ট্রাম্পকে বারবার চাপ দিতেন ।

ট্রাম্প নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সৌদি আরব ইতিমধ্যেই সংঘাতে যোগ দিয়েছে। ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "তারাও লড়াই করছে, তারাও লড়াই করছে" । তবে রিয়াদ থেকে এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরব এখনো প্রকাশ্যে সরাসরি সামরিক ভূমিকা নিতে চাইছে না, বরং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়, যাতে তারা ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরে চাপ দেয় । ইরানি জেনারেল সর্দার জব্বারি হুমকি দিয়ে বলেছেন, "হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া যেকোনো জাহাজ আমরা পুড়িয়ে দেব। এই অঞ্চল থেকে এক ফোঁটাও তেল বের হতে দেওয়া হবে না" । এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের তেল রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যায়, তাই এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে মিশর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত ১৫টি দেশ থেকে মার্কিন নাগরিকদের চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে । লেবাননেও বড় ধরনের ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৫২ জন নিহত হয়েছে এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বৈরুত সরকারকে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে ।

সূত্র : এনডিটিভি, নিউজউইক, দ্য গার্ডিয়ান, আল-জাজিরা ও এএফপি।

See More

Latest Photos